ঠাকুরগাঁওয়ে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে কারাম উৎসব পালিত

জাতীয় দেশজুড়ে ধর্ম

মোঃ জাহিদ হাসান মিলু, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: বর্নাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ওড়াঁও সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব কারাম পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বংশপরম্পরায় যুগ যুগ ধরে প্রতি বছর ওড়াঁও সম্প্রদায় এই কারাম উৎসব পালন করে আসছে।

কারাম একটি গাছের নাম। ওড়াঁও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি একটি পবিত্র গাছ। মঙ্গলেরও প্রতীক। প্রতি বছর এ উৎসবকে ঘিরে মুখরিত হয় ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের পাঁচপীরডাঙ্গা গ্রাম ও ওড়াঁও সম্প্রদায়ের বসবাসরত এলাকাগুলো। উৎসবে ওড়াঁও সম্প্রদায়ের লোকজন উপবাস করে কারাম গাছের ডাল কেটে আনেন। কারাম ডাল কেটে স্থায়ী ও অস্থায়ী পূজা মন্ডপে পুঁতে রেখে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে এই উৎসব শুরু হয়। এ সময় পুরো এলাকা হয়ে ওঠে ওড়াঁওসহ সব সম্প্রদায়ের মিলনমেলা।

শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৯ টায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার আয়োজনে সদর উপজেলার সালন্দর পাঁচপীরডাঙ্গা গ্রামে ওড়াঁও মহল্লায় আয়োজিত উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, জেলা প্রশাসক মো: মাহবুবুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন, পুলিশ সুপার মো: জাহাঙ্গীর হোসেন, সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব আলম মুকুল, জাতীয় আদিবাসি পরিষদের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ইমরান চৌধুরী সহ অনেকে। এসময় উৎসবে ঢাক-ঢোলের বাজনায় নেচে গেয়ে আনন্দ উপভোগ করে আদিবাসীদের পরিবার ও স্বজনরা। সঙ্গে যোগ দেয় শিশু কিশোররাও।

 

স্থানীয় ও অন্য জেলা থেকে আগত কামার উৎসব দেখতে আসা আদিবাসিরা জানান, একই রঙের পোশাক পর সারিবদ্ধ ভাবে গ্রামের নারী পুরুষরা ঢোল-মাদলের তালে তালে কারামের নৃত্য পরিবেশন দেখে খুশি ও আনন্দিত।

উদীচী ঠাকুরগাঁও জেলা সংসদ এর সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রিজু জানান, আমি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে প্রতিবারের ন্যায় এবারেও কারাম উৎসব দেখতে এসেছি। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার অনুষ্ঠানটি আরও ভাবগাম্ভীর্য ধারণ করছে ও প্রাণ পেয়েছে।

আদিবাসীদের দুই সহোদর ধর্মা ও কর্মা। ধর্মা কারাম গাছগে পূজা করতো। আর সেই গাছ একদিন কর্মা তুলে নিয়ে নদিতে ফেলে দেয়। তখন নানা বিপদ-আপদ ও অভাব দেখা দিলে আবার সেই গাছ খুজেঁ আনা হয়। তখন থেকে সেই গাছকে বিশ্বাস করে ধর্ম পালন করায় ধর্মা রক্ষা পান সব বিপদের হাত থেকে। আর কর্মা ধর্ম পালন না করায় তার ক্ষতির সম্মুখিন হয়। বিপদ-আপদ ও অভাব-অনটন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মূলত কারাম পূজা করা হয় বলে জানান, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান।

ওড়াঁও সম্প্রদায়ের কারাম উৎসব দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানান, জেলা প্রশাসকের সহধর্মিনী ও ঠাকুরগাঁও নারী কল্যাণ ক্লাবের সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস।

পুলিশ সুপার মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আদিবাসীদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল পদে নিয়োগ প্রকাশ হয়েছে। তারা যাতে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে ও আইন গত সহায়তায় তাদের জন্য আমার দুয়ার উন্মুক্ত।

আদিবাসীদের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে জেলা প্রশসাক মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, তাদের সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে যে প্রস্তুতি, সেই প্রস্তুতি ধরে তারা যদি এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে তারা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় পৌঁছে যাবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

পুজা অর্চনা শেষে গ্রামের তরুণ-তরুণীরাসহ সব বয়সের নারী-পুরুষরা শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আবারো ঢাক-ঢোলের বাজনায় নেচে-গেয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কারাম বৃক্ষের ডাল নদীতে বিসর্জনের মধ্যদিয়ে দিয়ে এ বছরের মতো শেষ করবে উৎসবটি ।

 

কালের ছবি/ রাজীব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *