ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন

অর্থনীতি জাতীয় দেশজুড়ে
মুহাম্মদ মোরশেদ আলম: করোনা ভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে এসএমই ফাউন্ডেশন। ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৪%। একজন উদ্যোক্তা সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। এ লক্ষ্যে ১৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সই করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন।
১৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার আগারগাঁও পর্যটন ভবন মিলনায়তনে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মোঃ মাসুদুর রহমানের সভাপতিত্বে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক এবং শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা। ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক ফারজানা খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোঃ মফিজুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোঃ মফিজুর রহমান বলেন, গত অর্থবছরে একমাত্র শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিসিক সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ শতভাগ বিতরণ করে সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এজন্য তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরের ২০০ কোটি টাকা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিতরণ শেষ করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তা ও নারী-উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রতি আহবান জানান তিনি।পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেন, এই প্রণোদনা প্যাকেজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে কোভিড-১৯ এর ক্ষতি কাটিয়ে এসএমই খাত শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, প্রথম দফার ১০০ কোটি টাকা সঠিকভাবে বিতরণ করে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রমাণ করেছে যে, তার সক্ষমতা আছে। সুতরাং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠানকে আরো বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়াসহ অধিক পরিসরে দায়িত্ব প্রদান করা প্রয়োজন। তাছাড়া দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের র্আথকি সক্ষমতা বাড়ানো ও আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

শিল্প প্রতিমন্ত্রী  কামাল আহমেদ মজুমদার এমপি বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ সুষ্ঠুভাবে বিতরণ হলে সরকারের নির্বাচনী লক্ষ্য অনুযায়ী নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে ও কর্মসংস্থান বাড়বে। সত্যিকার অর্থে এসএমই খাতের উন্নয়ন করতে হলে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা এসএমই পল্লী ও তাদের পণ্যের জন্য বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলক এমপি বলেন, কোভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ক্ষতি কাটিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতি সচল করতেই সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রবর্তক সজিব ওয়াজেদ জয়-এর নেতৃত্বে আইসিটি খাতে যে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, তার সুবিধা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে হবে। নতুন উদ্যোক্তা উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশন ও আইসিটি বিভাগ একসাথে কাজ করতে পাওে মর্মে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, সঠিক উদ্যোক্তারা যেন প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তা নিশ্চিত করা দরকার। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মোঃ মাসুদুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এসএমই খাতকে এগিয়ে নিতে না পারলে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গঠন কঠিন হবে। এজন্য এসএমই ফাউন্ডেশনের সক্ষমতা বিশেষ করে আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। ড. মাসুদ ২০০ কোটি টাকা বিতরণে ব্যাংক ও অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের জন্য অনুরোধ করেন।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, ব্র্যাংক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, দ্যা সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, আইডিএলসি ফাইন্যান্স এবং লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সারাদেশের প্রায় ১০০টি এসএমই ক্লাস্টার, চেম্বার, অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সারাদেশের নারী-উদ্যোক্তা এবং এসএমই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সুপারিশকৃত এসএমই উপখাত, ট্রেডবডি এবং গ্রুপের তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা এবং সিএমএসএমই খাতের জন্য সরকার ঘোষিত প্রথম দফার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ না পাওয়া পল্লী ও প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাগণকে ঋণ প্রদান করবে। মোট ঋণের ২৫-৩০% নারী-উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।করোনাভাইরাস (কোাভিড-১৯) পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং পল্লী এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের দ্বিতীয় দফার প্রণোদনার আওতায় মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মাঝে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। চলতি অর্থবছরে আরো ২০০ কোটি টাকা এসএমই ফাউন্ডেশনের অনুকূলে বরাদ্দ দেয় অর্থ বিভাগ।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ঋণ কর্মসূচি বিতরণ বিষয়ক নীতিমালা ও নির্দেশিকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, করোনা মহামারীর কারণে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে নি¤œবর্ণিত ক্যাটাগরির উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দেয়া হবে:

১. যারা সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণপ্রাপ্ত হননি;
২. অগ্রাধিকারভূক্ত এসএমই সাব-সেক্টর এবং ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা;
৩. নারী-উদ্যোক্তা;
৪. নতুন উদ্যোক্তা অর্থাৎ যারা এখনো ব্যাংক ঋণ পাননি;
৫. পশ্চাদপদ ও উপজাতীয় অঞ্চল, শারীরিকভাবে অক্ষম এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তাগণ।
প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তাগণ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পাবেন। ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২৪টি সমান মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। ব্যাংকের চাহিদাকৃত ডকুমেন্টসহ ‘সম্পূর্ণ/পরিপূর্ণ ঋণ আবেদনপত্র’ ব্যাংকের নিকট দাখিলের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ মঞ্জুর করে গ্রাহকের অনুকূলে বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। সাধারণভাবে একক ও যৌথ মালিকানাধীন উদ্যোগের অনুকূলে ঋণ বিতরণ করা হবে। তবে প্রান্তিক ক্ষুদ্র, বিশেষ করে নারী-উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতায় আনার লক্ষ্যে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫জন উদ্যোক্তার অনুকূলে গ্রুপভিত্তিক ঋণ বিতরণ করা যাবে। গত অর্থবছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এসএমই ফাউন্ডেশন অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করে উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক এক/একাধিক শাখায় ফোকাল কর্মকর্তা নির্ধারণ করবে। উদ্যোক্তারা ফোকাল কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করবেন। ফোকাল কর্মকর্তা এসএমই ফাউন্ডেশন, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখা এবং উদ্যোক্তাদের সাথে সমন্বয় করবেন।

 

কালের ছবি/ রাজীব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *