কুড়িগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্ট্যাটাসে জেলে যুবলীগ নেতা

আইন আদালত জাতীয় দেশজুড়ে

কালের ছবি ডেস্ক: কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ফেইসবুক পোস্টের অর্থের ভূল বোঝাবুঝিতে ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাবেক এক নেতার বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করেছেন উপজেলা যুবলীগের সাধারন সম্পাদক জাইদুল ইসলাম মিনু এবং এ মামলায় জেলে যেতে হয়েছে আসামী সেলিম মিয়াকে।

তথ্যমতে, ‘তাকে পাপ থেকে মুক্ত করো কান্নায় কান্নায়, এসেছে কান্নার দিন। কাঁদো বাঙালি কাঁদো’। এটি কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো’ কবিতার বাক্যাংশ। এ বাক্যাংশ নিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সেলিম মিয়া। এতেই বিপাকে পড়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মামলা করেছেন।

সমকালের তথ্যমতে, নিজের ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বুঝতে পারা মাত্র পোস্টটি সরিয়ে নিয়ে ভুল স্বীকার করলেও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে ওই বাক্যাংশটি যে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার তা জানেন না বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য জাইদুল ইসলাম মিনু। তিনি বলেছেন, বিবাদী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে এ প্রোপাগান্ডামূলক কুরুচিপূর্ণ লেখা লিখেছেন। অন্যদিকে মামলা নেওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন রৌমারী থানার ওসি।

গ্রেপ্তার সেলিম মিয়া উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়নের খেতারচর গ্রামের মৃত আবুল হাসেম সরকারের ছেলে। তিনি দাঁতভাঙা ইউনিয়নের ছাত্রলীগের স্কুলছাত্রবিষয়ক সম্পাদক পদে ছিলেন। তার বাবা প্রয়াত আবুল হাসেম সরকার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের (২০০৩-২০১৫) সভাপতি পদে ছিলেন।

জানা গেছে, সেলিম মিয়ার (৩৫) ওই পোস্টে ‘তাকে পাপ থেকে মুক্ত করো’ শব্দগুলোয় বঙ্গবন্ধুকে ‘অবমাননা’ করা হয়েছে- নেটিজেনদের কয়েকজন এমন মন্তব্য করেন। সেলিম নিজের ‘ভুল’ বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে পোস্টটি সরিয়ে নেন। আমিনুল বিএসসি নামে দাঁতভাঙা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের করা মন্তব্যের উত্তরে সেলিম লেখেন, ‘মামা বিষয়টি আমি খেয়াল করি নাই। যাহোক সেটা আমার ভুল হয়ে গেছে, সাথে সাথে ডিলেট করে দিয়েছি।’

ওই মন্তব্যের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘জন্মের শিক্ষা হয়েছে মামা, পোস্টটি আমি নিজে করি নাই। মোবাইল নিয়ে অন্য একজন করেছে, তারপরও আমি সরি।’ তবে তিনি ভুল স্বীকার করে পোস্ট সরিয়ে নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রতিপক্ষের লোকজন ততক্ষণে ওই পোস্টের স্ট্ক্রিনশট নিয়ে সংরক্ষণ করেন। পরে গত বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে রৌমারী উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ সদস্য জাইদুল ইসলাম মিনু বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সেলিম মিয়ার বিরুদ্ধে রৌমারী থানায় মামলা করেন। মামলার পরপরই পুলিশ সেলিমকে গ্রেপ্তার করে শুক্রবার কারাগারে পাঠায়।

অভিযুক্ত সেলিম মিয়ার দাবি, তিনি দোকানে মোবাইল রাখলে তার মোবাইল থেকে অন্য একজন পোস্টটি দেন। তিনি বিষয়টি বোঝামাত্রই ভুল স্বীকার করে পোস্টটি সরিয়ে নেন। এরপরও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে মামলায় ‘ফাঁসিয়েছেন’।
উপজেলার দাঁতভাঙা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম (বিএসসি) বলেন, সেলিম মিয়া ফেসবুকে তার পোস্টটি নিজে করেননি বলে তাকে জানিয়েছিলেন। সেটা তার অনিচ্ছকৃত ভুল ছিল। তিনি ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছেন এবং পোস্টটি সঙ্গে সঙ্গে ডিলিট করেছেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে এভাবে মামলা করাটা সমীচীন হয়নি বলে তিনি মনে করেন। সেলিম যুবলীগের একজন সক্রিয় কর্মী বলেও জানান আমিনুল ইসলাম।

অভিযুক্ত সেলিমের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে জানতেন না বলে দাবি করেছেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হারুনর রশীদ। তিনি বলেন, সেলিম গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর (নৌকা) পক্ষে কাজ করেছেন। আলোচিত পোস্টটি তিনি (সেলিম) নিজে করেননি বলেও দাবি করেছেন এবং সেটা তার অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে তাকে বলেছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যাপারে সাধারণ সম্পাদক তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেননি।

সেলিম মিয়ার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারকে ষড়যন্ত্র বলে মনে করছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ফলে তিনি চক্রান্তের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মিনু।

মামলার বাদী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য জাইদুল ইসলাম মিনু বলেন, বিবাদী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করার লক্ষ্যে অশ্নীল, অশালীন, প্রোপাগান্ডামূলক কুরুচিপূর্ণ লেখনী, শব্দাবলিযুক্ত ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করেছেন, যা সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে তার মনে হওয়ায় তিনি বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেছেন।

কোন ত্রুটিকে কেন্দ্র এ মামলা করেছেন এ প্রশ্নের জবাবে জাইদুল ইসলাম মিনু বলেন, ‘তাকে পাপ থেকে মুক্ত করো’ এ বাক্যকে কেন্দ্র করেই তার বিরুদ্ধে এ মামলা করেছেন। এ বাক্যটি একজন কবির জানালে তিনি বলেন, এটি কবির বাক্য কিনা তা তার জানা নেই।

রৌমারী থানার ওসি মোন্তাছের বিল্লাহ বলেন, বাদীর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে।

মামলার আগে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত করা হয়েছিল কিনা এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, ‘মামলা রুজুর আগে তদন্ত করা হয়নি।’ কিসের ভিত্তিতে এ মামলা নিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাপ থেকে মুক্ত করো’ বাক্যটি প্রয়োগ ও বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা করা হয়েছে। বাক্যটি যে একজন কবির এ কথা জানালে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইব্রাহীম খলিল বলেন, অভিযোগের পর প্রাথমিক তদন্ত করতে হবে। তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলে ওসি অভিযোগটি মামলা হিসেবে রুজু করতে পারেন। এতে আইনগত বাধা নেই। তবে অভিযোগের সত্যতা না পেলে কোনো অভিযোগই এফআইআর হিসেবে গণ্য করতে পারেন না। তিনি বলেন, অনলাইনে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রচার বা প্রকাশ করা হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে সেখানে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ও অভিযোগ থাকতে হবে।

কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্রাহাম লিংকন বলেন, ফেসবুক পোস্টে নির্মলেন্দু গুণের কবিতার অংশ তিনি তুলে ধরেছেন। এখানে অপরাধের কিছু নেই। এতে অপরাধ হলে কবি নির্মলেন্দু গুণও অপরাধী।

কালের ছবি/ রাজীব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *